তোমাদের অনুভব করি মর্মে মর্মে-
ডাঃ মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াহাব
এমবিবিএস ১ম বর্ষ থেকে ৫ম বর্ষ ফাইনাল, স্মৃতিতে আজো ভাস্বর প্রতিটি ক্ষণ, প্রতিটি মাস এবং বছর। আজ আমার বাবা বেঁচে নেই, মাঝে মাঝে মনে হলে একাকী এ শূন্যতাটুকু অনুভব করি পরতে পরতে, কিন্তু মেডিকেলের ২য় বর্ষের ফাইনাল তথা ১ম প্রফেশনাল পরীক্ষার দিনকয়েক পূর্বে বছর ধরে বাড়িতে না যাওয়া ছেলের সোনামুখ দেখার জন্য বাবা যখন প্রায় ২০ কিলোমিটার পায়ে হেটে অতঃপর ৫/৬ ঘন্টা বাসে চড়ে সিলেট মেডিকেলের সামছুদ্দীন হোস্টেলে তিন সন্ধ্যায় হাজির তখন খুব একটা খুশি হতে পারিনি। ১৪০০ পৃষ্ঠার এনাটমি ও ৪/৫ ভলিউম ফিজিওলজি বইয়ের কষাঘাতে চোখেমুখে যখন অন্ধকার দেখছিলাম, প্রতিদিন ১৪/১৫ ঘণ্টা পড়াশুনা করার পরও প্রতিটা মুহূর্ত যখন মানসিক চাপ আর পরীক্ষার আতঙ্কে ছিলাম প্রায় অর্ধপাগল তখন বাবার উপস্থিতি অতঃপর আথিতেয়তার পেছনে সময়ব্যয় বিরক্তিকরই মনে হচ্ছিল। তখনকার এ অনুভূতির জন্য নিঃসন্দেহে আমি আজ নিজে বাবা হওয়ার পর সার্বক্ষণিক অপরাধবোধে ভুগছি বৈ কি।
আমাদের সময়ে দু'এক বছর পর পর কোননা কোন মেডিকেল থেকে ১ম প্রফেশনাল পরীক্ষার পূর্বে দু’একজন পরীক্ষার্থীর রশিতে ঝুলেই হোক আর ছাদের উপর থেকে লাফ দিয়েই হোক আত্মহননের ঘটনা অস্বাভাবিক ছিল না। পরীক্ষার পূর্বে ডাইনিং হল থেকে খাওয়াদাওয়ার পর হাত না ধুয়ে রুমে চলে আসা, গোসলখানা থেকে বিবস্ত্র বেরিয়ে পরা এমনতর ঘটনাও মেডিকেলে বিরল নয়। আমাদেরই সাথের একজন পরীক্ষার আগে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে হোস্টেল থেকে চলে যাওয়ার পর আর কোনদিন ফিরে আসেনি, আরেকজন যতটুকু মনে পড়ে তবলীগে চলে গিয়েছিল যে চিল্লা অধ্যাবদি শেষ হয়নি।
১ম প্রফেশনালের  চেয়ে ৫ম বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষার চাপ কিন্তু আরো বেশি যেহেতু মেডিসিন, সার্জারি এবং ধাত্রী ও প্রসূতি বিদ্যা একসাথে মাত্র দেড় বছরে শেষ করতে হয়। ‘গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ডে’ও এখন পর্যন্ত এমবিবিএস কোর্স সবচেয়ে কঠিন এবং দীর্ঘ বলে উল্লেখিত। ৫ম বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষার পর পরই বাড়ির টানে ক্লান্ত শরীরে স্বাভাবিক হাটার পথ পরিহার করে ভৈরব ঘুরে লঞ্চে প্রায় দেড় দিনে বাড়ি পৌঁছা অতঃপর মা বাবা ভাইবোন এবং আত্মীয়-স্বজনের উষ্ণ আলিঙ্গন আজো মনে পড়ে।
এতগুলি কথা বলার পায়তারা এজন্যই, সোমবার যে ১৩ জন ছেলেমেয়ে কিশোর বয়সে মা বাবা আত্মীয়-স্বজন ছেড়ে শত শত মাইল দূরে এসে প্রায় পাঁচটা বছর অমানবিক আর অক্লান্ত পরিশ্রম শেষে চিকিৎসা বিজ্ঞানের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে প্রিয়জনের টানে পরীক্ষা শেষ হতে না হতেই দলবেঁধে বাড়ি ছুটছিল মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় সব স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।
এদের মা-বাবার হস্তদ্বয় তাদের সন্তানের সোনামুখের কোমল স্পর্শ পাবে না আর কোনদিন, এদের কলকাকলিতে রাগীব রাবেয়া মেডিকেলের প্রাঙ্গণ আর কখনো মুখরিত হবে না, প্রাণপ্রিয় শিক্ষকরা অসহায় চেনা মুখগুলো আর দেখবেনা কখনো; শ্রেণীকক্ষ, লাশকাটাঘর, লাইব্রেরী, অপারেশন থিয়েটারে আর কোনদিন পড়বে না এদের পদধূলি। হয়ত স্বজনের আহাজারি এখনো শেষ হয়নি, হয়ত ফুলের তোড়া নিয়ে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাতে  আসা কোন আপনজন এখন সেই বাসি তোড়া নিয়ে সজল নয়নে দাঁড়িয়ে আছে সমাধিতে অর্পনের প্রত্যশায়। আমার সেই ছাত্রজীবন, রাতজাগা, পরীক্ষা আর বাড়ি ফেরার অনুভূতিগুলো কেন জানি এদের সাথে বার বার মিলাতে চেষ্টা করছিলাম। হে অকালে চলে যাওয়া অসীম পথযাত্রী হবু চিকিৎসকেরা, তোমাদের মা বাবা কি হারাল তা বুঝানোর ভাষা আমাদের নেই, তবে তোমাদের দেশ হারাল অনন্য সম্পদ, আমাদের দেশ হারাল কৃতজ্ঞতার অনস্বীকার্য এক যোগসূত্র। তোমাদেরকে অনুভব করি মর্মে মর্মে।
-
প্রথম পাতা