হবিগঞ্জ শহরে উন্নয়ন মেলায় দর্শনার্থী ও সেবা গ্রহীতাদের উপচেপড়া ভিড়-
পরিবার পরিকল্পনা স্টলে প্রসবকালীন সেবা, কিশোর কিশোরী সেবা, প্রসবোত্তর সেবা, জরুরী প্রসূতি দেয়া হচ্ছে ॥ গর্ভবতী মহিলারা চেক-আপ করাচ্ছেন ॥ প্রতিবন্ধী শনাক্তকরণ জরিপের আওতায় তাৎক্ষণিক পরিচয়পত্র প্রদান করা হচ্ছে ॥ সদর উপজেলা ভূমি অফিসের স্টলে পর্চার আবেদন গ্রহন এবং প্রদান করা হচ্ছে ॥
উন্নয়নের অংশ হিসেবে হবিগঞ্জের ৯টি পরিবারকে শুটকি মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণে সহায়তা করা হয়েছে। হাওরের ঢেউ থেকে গ্রাম রক্ষার জন্য ২১টি গ্রাম প্রতিরক্ষা দেয়ালের কাজ ও ৪টি স্লোপ প্রটেকশনের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। এতে ব্যয় হয়েছে ৮ কোটি ১৭ লাখ টাকা
এসএম সুরুজ আলী ॥ হবিগঞ্জ শহরের নিমতলায় জেলা প্রশাসন আয়োজিত ৩দিনব্যাপী উন্নয়ন মেলার দ্বিতীয় দিনে গতকাল হাজার হাজার দর্শনার্থী ও সেবা গ্রহীতাদের উপচেপড়া ভিড় ছিল। বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ মেলা উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনের পরই মেলায় দর্শনার্থীদের ভিড় জমে। গতকাল ২য় দিনে মেলার স্টলগুলো থেকে সাধারণ লোকজন শেষ দিনে চিকিৎসা সেবাসহ বিভিন্ন সুবিধা গ্রহণ করেছেন। অনেককে ভ্যাট, আয়কর রিটার্ণ গ্রহন ও আয়কর জমা প্রদানসহ বিভিন্ন সুবিধা দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ভূমি অফিসের স্টল, স্বাস্থ্য বিভাগ, পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ, বিদুুৎ বিভাগ, নির্বাচন অফিস, বিআরটিএ হবিগঞ্জ সার্কেল এর স্টলসহ বেশ কয়েকটি স্টল থেকে সাধারণ লোকজন সবচেয়ে বেশি সেবা গ্রহন করেছেন। পরিকল্পিত পরিবার গঠন করা পরামর্শ যেমন পেয়েছেন, তেমনি অনেকেই বিদুুতের নতুন সংযোগ পেয়ে নিজের ঘর আলোকিত করার স্বপ্ন দেখছেন। আবার মেলা থেকে স্থানীয় সরকারকে কিভাবে শক্তিশালীকরণ, স্থানীয় সরকারের কর্মপরিকল্পনা, সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে, প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করতে কত টাকা ব্যয় হয়েছে তা জানতে পেরেছেন। কৃষকরা জেনেছেন অত্যাধুনিক পদ্ধতিতে কিভাবে কৃষি ক্ষেত্রে উন্নয়ন, কৃষি ঋণ গ্রহনের সুযোগ সুবিধাও। গতকাল দুপুরে সরেজমিনে মেলা প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা গেছে, মানুষের উপচেপড়া ভিড়। এ সময় দর্শনার্থীদের সাথে আলাপ করলে তারা জানান, অনেক আনন্দ নিয়ে এই ব্যতিক্রম মেলা দেখার জন্য এসেছি। মেলা থেকে আমরা ভবিষ্যত জীবনে চলার পথের অনেক কিছু শিখেছি। এ ধরণের মেলা প্রতি বছর হওয়া প্রয়োজন। তবে মেলায় সরকারি বিভিন্ন কার্যক্রমের সুযোগ সুবিধা যেভাবে দেয়া হয়েছে, সেভাবে সাধারণত সরকারি সুযোগ সুবিধা দেয়া হয় না। অনেক সাধারণ লোকজন বিভিন্ন স্টলের কার্যক্রম না জানায়, তারা সেবা গ্রহন করতে পারেননি।
২য় দিনে জেলা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের স্টলে গিয়ে দেখা গেছে, নারীদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি। এখানে পরিবার পরিকল্পনা সেবা, প্রসবকালীন সেবা, কিশোর কিশোরী সেবা, প্রসবোত্তর সেবা, জরুরী প্রসূতি, সাধারণ রোগী, ৫ বছরের শিশুদের সেবা দেয়া হচ্ছে। এছাড়া পরিকল্পিত পরিবার গঠনেরও পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। এ স্টলের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ডাঃ নাসিমা খানম ইভা। স্টল পরিচালনায় ছিলেন মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের মেডিকেল অফিসার ডাঃ এমএ মান্নান। এ স্টলে ডাঃ আব্দুর রব মোল্লাসহ স্বাস্থ্য বিভাগের ৭সদস্য সেবা দিচ্ছেন। ডাঃ নাসিমা খান ইভা জানান, আমাদের স্টলে দু’দিনে অর্ধশতাধিক গর্ভবতী মহিলা চেক-আপ করেছেন। তাদের গর্ভকালীন সময়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। আবার জন্ম নিয়ন্ত্রণ রাখতে অনেককে কনডম ব্যবহার করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। যারা একাধিক বাচ্চা নিয়েছেন তাদের পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহন করার পাশাপাশি পরিবার পরিকল্পনা বর্জ্য নিস্কাশনের কাউন্সিলিং, পুষ্টি বিষয়ে কাউন্সিলিং পরামর্শ দেয়া হয়েছে। হবিগঞ্জ জেলা মদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কার্যালয় স্টলে মাদক বিরোধী স্বাক্ষর নেয়া হচ্ছে। মাদক যাতে কেউ গ্রহন না করেন এ ব্যাপারে পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। লিফলেটের মাধ্যমে তাদের মাদকের বিভিন্ন ক্ষতিকারক বিষয় তুলে ধরা হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের স্টলে রক্তের গ্রুপ নির্ণয়সহ স্বাস্থ্য সেবা দেয়া হচ্ছে। দু’দিনে দুই শতাধিক মানুষকে সেবা দেয়া হয়েছে। জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তর ও প্রতিবন্ধী সেবা সাহায্য কেন্দ্রের স্টল থেকে সরকারের নিরাপত্তা বেস্টনী আওতায় বয়স্ক ভাতা, বিধবা ও স্বামী নিগৃহিতা ভাতা, অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম ২০০৮-০৯ ও ২০১৬-১৭ অর্থ বছর পর্যন্ত উপকারভোগীর সংখ্যা ও ভাতার হার বৃদ্ধি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়। প্রতিবন্ধী শনাক্তকরণ জরিপের আওতায় তাৎক্ষণিক পরিচয়পত্র প্রদান করা হয়। এ স্টল থেকে অনেক প্রতিবন্ধী ফিজিওথেরাপী গ্রহন করেন। বিভিন্ন প্রকার কাউন্সিলিং করা হয়। হবিগঞ্জ সদর উপজেলা ভূমি অফিসের স্টল থেকে ২দিনে নকল ও পর্চার আবেদন গ্রহন করা হয় এবং প্রদানও করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন স্টলে তাদের সেবা প্রদান করা হচ্ছে।
উন্নয়নের রোল মডেল শেখ হাসিনা বাংলাদেশ স্লোগানকে সামনে রেখে ৩দিনব্যাপী মেলায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর এলজিইডি, হবিগঞ্জ সড়ক বিভাগ, হবিগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগের স্টলে প্রদর্শনীর মাধ্যমে এ সরকারের উন্নয়নের বিবরণ তুলে ধরা হয়। বর্তমান সরকারের ৯ বছরের শাসনামলে জেলার ৮টি উপজেলায় যেসব কাজ বাস্তবায়ন করা হয়েছে তার ব্যয়ের পরিমাণ এবং যেসব কাজ চলমান আছে তার ফিরিস্তি তুলে ধরা হয়। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের অধিনে জেলায় ২টি উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্স নির্মাণ/সম্প্রসারণ, ২৩টি ইউনিয়ন কমপ্লেক্স ও ২৭টি হাটবাজার/ঘাট নির্মাণ করা হয়েছে। এ কাজে মোট ২২.০৮ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। বর্তমানে ৩টি কাজ চলমান রয়েছে। জেলায় মোট ৬৯১.৫১ কিলোমিটার পল্লি সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়েছে। এ কাজে ১১৬.৩৯ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। বর্তমানে ১৩৭.৭৭ কিলোমিটার সড়ক রক্ষণাবেক্ষণের কাজ চলমান আছে। চলমান প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে আগামী দুই/তিন বছরে আরও ১৮০ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করা হবে। এলজিইডি হবিগঞ্জ জেলায় ২১২০ মিটার দৈর্ঘ্যরে ২২০টি সেতু/কালভার্ট নির্মাণ করেছে। এ কাজে মোট ৬০.৪৪ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। চলমান প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে আগামী দুই/তিন বছরে আরও ৪০০মিটার সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ করা হবে। বর্তমানে জেলায় ৩৫৪.৪০ মিটার এর কাজ চলমান আছে। জেলায় ৩২৪টি নতুন প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন, ১৫০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কক্ষ সম্প্রসারণ, ১ পিটিআই এবং উপজেলা রিসোর্স সেন্টার নির্মাণ করা হয়েছে। এতে ২০ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। বর্তমানে ৫০টি বিদ্যালয়ের কাজ চলমান। এছাড়া চলমান প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে আগামী দুই/তিন বছরে আরও ১০০টি বিদ্যালয় নির্মাণ/সম্প্রসারণ করা হবে। জেলার ৮টি উপজেলায় মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ও অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ২৬টি বাসগৃহ নির্মিত হয়েছে। এর মধ্যে ৮টি নির্মাণাধীন। হাওর ইনফ্রাকস্ট্রাকচার এবং লাইভলিহুড প্রজেক্ট ও হাওর ম্যানেজমেন্ট প্রজেক্ট এর আওতায় হবিগঞ্জ জেলা অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি ২৮টি মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এবং ৫৫টি বিল হস্তান্তর করা হয়েছে। ১টি প্লাবন ভূমিতে মাছ চাষ করা হয়েছে। ২৮টি বসতবাড়ি পুকুরে মাছ চাষ করা হয়েছে। ৯টি পরিবারকে শুটকি মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণে সহায়তা করা হয়েছে। হাওরের ঢেউ থেকে গ্রাম রক্ষার জন্য ২১টি গ্রাম প্রতিরক্ষা দেয়ালের কাজ ও ৪টি স্লোপ প্রটেকশনের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। এতে ৮ কোটি ১৭ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। জেলা সড়ক বিভাগের মাধ্যমে ৩০৮.৩২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩টি জাতীয় মহাসড়ক, আঞ্চলিক মহাসড়ক ৫টি, জেলা মহাসড়ক ৬টি, ৬টি সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। ৯টি সেতু নির্মাণ এবং ২টি সেতুর কাজ চলমান রয়েছে। বাল্লা স্থলবন্দর সড়ক নির্মাণসহ ৯টি উন্নয়ন প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। রক্ষণাবেক্ষণ খাতের আওতায় আরো ৩টি সড়ক নির্মাণ চলমান রয়েছে। হবিগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালের নতুন ভবন, চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট ভবন, বানিয়াচঙ্গ উপজেলার বিথঙ্গল পুলিশ ফাঁড়ি, জেলা পাসপোর্ট অফিস, জেলা নির্বাচন কমিশন অফিস, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য হোস্টেল ভবন, লাখাই’র স্বজনগ্রাম পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র, হবিগঞ্জ পুলিশ সদর সার্কেল কাম ভবন, হবিগঞ্জ পুলিশ লাইনে মহিলা পুলিশ ব্যারাক, মনতলা তদন্ত কেন্দ্রসহ ২৭টি প্রকল্পের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করে। এছাড়াও কয়েকটি প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। সন্ধ্যায় ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ১০টি উদ্যোগ ও রূপকল্প ২০২১ এবং ২০৪১’ শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। জেলা প্রশাসক মনীষ চাকমা’র সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রশাসনের কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন। সন্ধ্যায় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে স্থানীয় ও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আগত শিল্পীরা সঙ্গীত পরিবেশন করেন।

-