হবিগঞ্জের সর্বত্র আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ইন্টারনেটভিত্তিক গেম “ব্লু-হোয়েল”-
এসডিআর পিনাক ॥ হবিগঞ্জের সর্বত্র আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ইন্টারনেটভিত্তিক গেম “ব্লু-হোয়েল”। ঢাকার সেন্ট্রাল রোডের স্কুল পডুয়া মেধাবী এক কিশোরীর আত্মহত্যার পর সম্প্রতি হবিগঞ্জেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এই মরণঘাতী গেমটি। ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হবিগঞ্জের উঠতি বয়সী তরুণ-তরুণীকে গেইমটি নিয়ে তাদের কৌতুহল প্রকাশ করতে দেখা গেছে। এন্ড্রয়েড মোবাইলের প্লে-স্টোরে গেমটি না থাকায় অনেককেই গেইমটির লিংক পেতে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিতেও দেখা গেছে। মূলত একটি সাইটে গিয়ে গেমটি খেলার জন্য আবেদন করতে হয়। যখন কিউরেটরা আবেদনকারীকে যোগ্য হিসেবে সিলেক্ট করে তখনই গেইমের লিংক দেয়। তবে সবাইকে গেইম লিংক দেয় না। হবিগঞ্জের কেউ এই গেমে আসক্ত হতে পারে এই আশংকায় আমরা গেমটির জন্য আবেদনের সাইট এড্রেস এখানে দিলাম না।
বিভিন্ন গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, এ পর্যন্ত এ গেমটি খেলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রায় ১৩০ জনেরও বেশী আত্মহনন করেছে। তবে এদের সবাই কিশোর-কিশোরী। বলা হচ্ছে, এটি এমন একটি গেম যেখানে ঢোকা যায়, কিন্তু বের হওয়া কঠিন। আর বের হতে না পারা মানে আত্মহনন দেওয়া। বলা হয়, এই গেমিং অ্যাপ মোবাইলে একবার ডাউনলোড হয়ে গেলে তা আর কোনো ভাবেই মুছে ফেলা সম্ভব নয়। শুধু তাই নয়, ওই মোবাইলে ক্রমাগত নোটিফিকেশন আসতে থাকে যা ওই মোবাইলের ইউজারকে এই গেম খেলতে বাধ্য করে। নিয়ম অনুযায়ী একবার এই গেম খেললে বের হওয়া যায় না। কেউ বের হতে চাইলেও তাদের চাপে রাখতে পরিবারকে মেরে ফেলার হুমকি পর্যন্ত দেয়া হয় বলে প্রচলিত আছে। 
এখন প্রশ্ন আসতেই পারে, কি এমন গেম যে শেষ পর্যন্ত নিজের জীবন দিতে হবে!
গেমটি কিঃ ‘ব্লু-হোয়েল’ মোটেও ইন্টারনেট ভিত্তিক অন্যান্য সফটওয়্যার, অ্যাপ্লিকেশন কিংবা নিছক গেম নয়। এটি সোশ্যাল মিডিয়া ভিত্তিক একটি ডিপওয়ে গেম। ২০১৩ সালে রাশিয়ায় শুরু হয় ওই মারণ খেলাটি। প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটে দু'বছর পরে। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, নীল তিমিরা মারা যাওয়ার আগে জল ছেড়ে ডাঙায় ওঠে, যেন আত্মহত্যার জন্যই। সেই থেকেই এই গেমের নাম হয়েছে ‘ব্লু-হোয়েল' বা নীল তিমি। মূলত নীল তিমির জীবদ্দশাকে কেন্দ্র করেই গেমটি তৈরি করেছেন রাশিয়ার সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ও মনোবিজ্ঞানের এক ছাত্র ফিলিপ বুদেকিন। ফিলিপ রাশিয়ার নাগরিক। ১৮ বছর বয়সে ফিলিপ ২০১৩ সালে প্রথমে ব্লু-হোয়েল নিয়ে কাজ শুরু করেন। প্রথমে তিনি সামাজিক মাধ্যমে 'এফ৫৭' নামে একটি গ্রুপ তৈরি করেন। যেসব মানুষ সমাজের জন্য অপ্রয়োজনীয় ৫ বছরের মধ্যে তাদের ধ্বংস করার পরিকল্পনা করেন।
৫০ টি ধাপ নিয়ে গেমটি শেষ করতে হয়। প্রতিদিন ১টি করে চ্যালেঞ্জ নিয়ে মোট ৫০ দিনে গেমটি শেষ করতে হয়। এই গেমের বিভিন্ন ধাপে রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। ব্যবহারকারীদের ভৌগলিক অবস্থানের ভিত্তিতেই টাস্ক বা চ্যালেঞ্জ পাল্টাতে থাকেন ব্লু-হোয়েল এডমিন। একইভাবে ব্যবহারকারীদের বয়স অনুসারে তা পাল্টাতে থাকে। চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে সাধারণত রয়েছে। ১) একটি ব্লেড নিজের হাতে F57 লেখা ও ছবি তুলে কিউরেটরকে পাঠানো ২) ভোর ৪টা ২০ মিনিটে উঠে কিউরেটর এর পাঠানো ভয়ঙ্কর ভিডিও দেখতে হবে। ৩) নিজের হাতে নোখে নোচার মতো ব্লেড দিয়ে কাটতে হবে, খুব গভীর নয়। মাত্র তিনটি দাগ কাটতে হবে ও ছবি তুলে কিউরেটরকে পাঠাতে হবে। ৪) কোনো সাদা পাতায় তিমির ছবি নিজ হাতে অঙ্কন করতে হবে ও ছবি তুলে কিউরেটরকে পাঠাতে হবে। ৫) যদি গেমার তিমি হতে ইচ্ছুক থাকে তাহলে পায়ে ব্লেড দিয়ে ‘Yes’ লিখতে হবে। যদি না হয়, তাহলে শরীরে ব্লেড দিয়ে কাটাকাটি করতে হবে অসংখ্য ও নিজেকে সাজাতে দেওয়া। ৬) সাংকেতিক ভাষায় বা গোপন অর্থে কিছু লিখতে হবে। ৭) F40 ব্লেড দিয়ে হাতে লিখতে হবে ও ছবি তুলে কিউরেটরকে পাঠাতে হবে। ৮) স্যোসাল মিডিয়াতে I am a Whale লিখে স্ট্যাটাস দিতে হবে ৯) নিজের ভয় কাটাতে হবে। ১০) ভোর ৪:২০ তে ঘুম থেকে উঠে ছাদে যেতে হবে, যত উঁচু ছাদ হবে তত ভালো ১১) ব্লেড দিয়ে নিজের হাতে তিমি অঙ্কন করতে হবে ও ছবি কিউরেটরকে পাঠাতে হবে। ১২) সারাদিন Horror Movies দেখতে হবে। ১৩) কিউরেটর এর পাঠানো Music শোনা। ১৪) নিজের ঠোঁট কাটতে হবে। ১৫) হাতে বার বার সূঁচ দিয়ে আঘাত করতে হবে ও ছবি তুলে কিউরেটরকে পাঠাতে হবে। ১৬) নিজের সাথে কিছু যন্ত্রণাদায়ক করতে হবে ও ছবি তুলে কিউরেটরকে পাঠাতে হবে। ১৭) উঁচু ছাদে যেয়ে, কিছুক্ষণ কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকা। ১৮) উঁচু ছাদে যেয়ে কিছুক্ষণ কিনারায় হাঁটা ১৯) ক্রেনে ওঠা বা প্রয়াস করা। ২০) কিউরেটর Check করবেন, গেমার এর প্রতি বিশ্বাস করা যায় কি-না। ২১) কোনো Whale এর সাথে কথা বলা (এখানে Whale বলতে যে Game খেলছে অর্থাৎ গেমারকে বোঝাচ্ছে)। গেমার বা হোয়েল দুটিই বলা যায় এই ক্ষেত্রে। অথবা, কিউরেটর এর সাথে কথা বলা। ২২) ছাদে যেয়ে পা নীচের দিকে রেখে বসে যাওয়া। ২৩) সাংকেতিক ভাষায় বা গোপন অর্থে কিছু লিখতে হবে। ২৪) গোপন কিছু কাজ করতে হবে। ২৫) Whale এর সাথে দেখা করতে হবে।  ২৬) কিউরেটর মৃত্যুর তারিখ জানাবে এবং সেটা মেনে নিতে হবে। ২৭) ভোর ৪:২০ তে উঠে নিজের এলাকা সংলগ্ন রেললাইনের কাছে যেতে হবে। ২৮) সারাদিন কারোর সাথে কথা না বলা। ২৯) তিমির মতো আওয়াজ বের করা/ প্রয়াস করা। ৩০) ৩০ দিন থেকে ৪৯ দিন পর্যন্ত ভোর ৪:২০ তে ঘুম থেকে উঠে প্রত্যহ Horror Movie দেখতে হবে, ব্লেড এ করে শরীরে বিভিন্ন অংশে কাটতে হবে, Whale এর সাথে কথা বলতে হবে। ৫০) ৫০ তম দিন অর্থাৎ খেলার শেষ দিন অর্থাৎ গেমার এর অন্য জগতে যাবার দিন অর্থাৎ গেমার এর বিজয়ী হবার দিন উঁচু স্থান থেকে বা বিল্ডিং থেকে ঝাঁপ দিতে হবে। এতেই Game এর সমাপ্তি ঘটবে। এডমিনদের সঙ্গে খেলোয়াড়দের যোগাযোগ করার উপায় সম্পর্কে কাউকে বলা নিষেধ; টাস্ক শেষ করার সমস্ত প্রমাণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে মুছে ফেলার নির্দেশনাও থাকে এমনটাই জানতে পেয়েছেন তদন্তকারী দল।
বলা হচ্ছে, যেসব কম বয়সী ছেলে-মেয়ে অবসাদে ভোগে, তারাই অসাবধানতাবশত এই গেমে আসক্ত হয়ে পড়ে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কোনো ক্লান্তি বা বিষন্নতা দূর করার গেম নয়। আত্মহত্যার প্রবেশপথ মাত্র। এ গেইমে কাউকে আসক্ত হতে দেখলে বিআরটিকে অবহিত করার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারণা করা হচ্ছে।

-