বাবা দিবস-
বাবা দিবস
বাবা দিবস ঃ আমার বাবা
তাহমিনা বেগম গিনি
আজ ১৮ই জুন বাবা দিবস। আমাদের সময় এত দিবসের ছড়াছড়ি ছিল না। এখন ৩৬৫ দিনের থেকে বেশী দিবস আছে এক একটি নামকরণ নিয়ে। বাবা দিবসের উৎপত্তি কোথায় কখন হয়েছিল আমার জানা নেই। তারপরও বাবা দিবস এজন্য কলম ধরা। বয়সের হিসেবে আমি এখন জীবনের চতুর্থ অধ্যায় পার করছি। আমার বাবা গত হয়েছেন একুশ বছর আগে-এমনি জুন মাসে। কিন্তু আমার প্রতি মুহূর্তে বিশেষ করে দুঃখ, কষ্ট, বেদনার সময়গুলোতে কেন জানি বাবাকেই মনে পড়ে। পিতা মাতার প্রথম সন্তান আমি। বড় হয়ে শুনেছি প্রথম সন্তান মেয়ে হয়েছি সেই জন্য আমার পিতা নাকি মনোক্ষুন্ন হয়েছিলেন। কিন্তু আমি আমার জীবনে বাবার কাছ থেকে এর সমান্যতম কষ্টও অনুভব করিনি, বরং আমার বাবার ভাষায় আমি ছিলাম পরিবারের লক্ষ্মী। সরকারী উচ্চপদে বাবা চাকুরী করতেন বিধায় আমি অনেক আরাম-আয়েশে শৈশব, কৈশোর কাটিয়েছি। কেমন ছিলেন আমার পিতা। এক কথায় বলতে গেলে অনেক নিরীহ, শান্ত, সৎ, সন্তানবাৎসল একজন পিতা ছিলেন তিনি। তখন চাকুরীতে বেতন ছিল কম-হয়তো আমাদের সব আবদার পূরণ করতে পারতেন না সব সময়। কিন্তু তারপরও উপলদ্ধি করেছি, যতটুকু তার দ্বারা সম্ভব তা করতে চেষ্টা করেছেন। আমার পরম নির্ভরতার, আশ্বস্ততার এবং কথা বলার স্থান ছিলেন তিনি। এখনও মনে পড়ে স্কুলে পড়ার সময় নিজে সাথে করে আমাদের তিন বোনকে নিয়ে যেতেন, ভাল ভাল ইংরেজী সিনেমাগুলো মর্নিংশোতে দেখাতে। নিয়ে যেতেন স্টেডিয়ামে বা অন্য কোথায় অনুষ্ঠিত যে কোন অনুষ্ঠানে। আমি পড়াশোনা ছাড়া কোনো কিছুই করতে চাইতাম না, এজন্য আমার মা’র অভিযোগের অন্ত ছিল না। ছোট দুইবোন মার সাথে টুকিটাকি সংসারের কাজ কর্ম করতো। বাবার কাছেই ছিল মার এই অভিযোগ। কিন্তু সর্বদা এই ব্যাপারে আমার পিতা ছিলেন নিরুত্তর, নিশ্চুপ। বলতেন-ওর এসব কাজ করা লাগবে না, ওতো কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান হবে। কিন্তু বাবা তোমার এই ইচ্ছা আমি পূরণ করতে পারিনি। অনেক ভাল ফলাফল থাকা সত্ত্বেও আমার আর চাকুরী করা হয়ে ওঠেনি। এই দুঃখবোধটা আমার এখনও রয়ে গিয়েছে। কন্যা বড় হলে তার বিয়ের চিন্তা সব পিতামাতারই থাকে। কিন্তু এ ব্যাপারে আমার পিতার অত তাড়াহুড়া ছিল না। তারপরও আত্মীয় স্বজনের তাড়নায় যখনই পাত্র দেখতেন সব এলাকার পাত্র খুঁজতেন। উনি বলতেন আমি গিনিকে এমন জায়গায় বিয়ে দেবো যেন প্রতিদিন তাকে দেখতে পাই। কি নিদারুন পিতৃ ¯েœহ। আমার পছন্দের বিয়ে। বাবাকে যখন বলেছিলাম, আমার আজও মনে আছে আমার হাত দুটি ধরে অনেক কেঁদেছিলেন। বারবার না করেছিলেন এবং কতগুলো কথা বলেছিলেন। তখন সব কিছুই আমার কাছে অন্ধ ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে আমার সংসারিক, বৈবাহিক জীবনে বাবার সব কথাকেই সত্য হতে দেখেছি। তারপরও বাবা খুশী ছিলেন আমি অনেক ভাল আছি সেজন্য। উনার আর কোনো দুঃখ বোধ ছিল না। বাবার কথা লিখে শেষ করা যায় না। আমার সকল কৃতিত্ব মনে হতো যেন বাবার কৃতিত্ব। আমার সকল কষ্ট মনে হতো বাবার কষ্ট। আমি কখনোই বেশী সাজগোজ করতাম না। যদি কখনো একটু সেজেছি বাবাকেই বেশী খুশী হতে দেখতাম। সংসার এবং বিষয় আশয়ে আমার বাবা অনেক উদাসীন ছিলেন। এই কৃতিত্ব পুরোটাই আমার মা’র। তারপরও কেন জানি মা’র থেকে (বেঁচে আছেন) মৃত বাবার জন্য আমার এখনও অন্তর কাঁদে। যখন কেউ আমাকে কষ্ট দেয়, দুঃখ দেয়, খুব একাকীত্ব অনুভব হয় তখন একা একা বাবার জন্যই কাঁদি। মনে হয় বাবা থাকলে তাকে বলতাম কিন্তু মা কে বলতে ইচ্ছে করে না। এখনও মাঝে মাঝে মনে হয় বাবা যেন আমায় ডাকছে সেই আগের মতো। বাবা তোমাকে খুব মনে পড়ে। কোনোদিন তোমাকে বলতে পারিনি বাবা তোমাকে অনেক ভালবাসি। সত্যি বাবা তোমায় খুব ভালবাসি।
আমার পরিবারে আরেকজন বাবা আছেন। আমার দুই ছেলের বাবা। আমার বাবা আর এই বাবার মাঝে অনেক ফারাক। আমার কাছে বাবা ছিলেন বন্ধুর মত। মেয়েদের সাথে বাবাদের এমন সম্পর্কই হয়। কিন্তু আমার ছেলেদের বাবা তার দায়িত্ব সম্পর্কে আমার বাবার থেকেও সচেতন। এখন পর্যন্ত তাদের প্রতি তিনি দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। এমন বাবা আমি কমই দেখেছি। আমার দুই ছেলে অনেক ভাগ্যবান আমি বলবো এমন বাবা পেয়ে। তাদের মাথার উপর আছেন যেন ছাতা হয়ে। ছেলেরা উপলদ্ধি করে কি না জানিনা আমি সব দেখি বলেই লিখলাম। আমি সব সন্তানকেই বলবো বাবা মানে- নিরাপদ আশ্রয়, বাবা মানে নিশ্চিন্তে ঘুমানো, নিশ্চিন্তে খাওয়া, বাবা মানে সব আদর, সোহাগ, শাসন। যাদের বাবা নেই তারাই জানে বাবার অভাব কতখানি কষ্টদায়ক। তাই বাবা দিবসে সব সন্তান একটি ফুল দিয়ে হলেও বাবাকে বুঝতে দাও বাবা তোমার জীবনে কতখানি। না হলে বাবাকে জড়িয়ে ধরে একটি বার বলে দেখো “বাবা তোমায় অনেক ভালবাসি”- দেখবে বাবার চোখ দুটি জলে ভরে উঠেছে। আজকের দিনে আমার বাবাকে বলছি- বাবা তোমার অভাব খুব অনুভব হয়। তুমি যেখানেই থাকো ভালো থাকো বাবা। মনে হয় তুমি একটিবার আমার মাথায় হাতটি রাখো। পৃথিবীর সব বাবাদের অভিবাদন।
-